শনিবার || ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ || ১১:০১:২৪ সকাল

feature

পোলট্রি ফার্মিং- এ জীবাণু নিরাপত্তা ব্যবস্থা

প্রকাশ: শুক্রবার || আগস্ট ৭ ২০২০ || ১০:১৯:৫৭ PM

Share on Facebook   Share on Twitter   Leave Your Comment  Share via Email  Google Plus 

ডাঃ হানিফ নাজির চৌধুরী
নতুনই হোক বা পুরাতনই হোক পোল্ট্রি শিল্প প্রসারের ক্ষেত্রে ইহা আজ বাস্তব সত্য যে জীবাণু নিরাপত্তা ব্যবস্থা যদি যথাযথভাবে কার্যকর করা না হয় তবে পোল্ট্রি ফার্মকে লাভজনকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মনে রেখেই জীবাণু নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য পরামর্শ দেওয়া হলো। যেগুলি অনুসরণ করলে খামারীগণ বিভিন্নপ্রকার রোগের প্রকোপ কমাতে সক্ষম হবেন এবং ভ্যাকসিন প্রয়োগের পর অত্যন্ত ভাল ফল লাভ করবেন। অধিকন্তু খামারে পালিত পোল্ট্রির সকল উন্নতজাতের উৎপাদন বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ফল লাভ করবেন যার দ্বারা ফার্ম হইতে ভাল আয় করা সম্ভব হবে।
যারা নতুন খামারী তাদেরকে প্রথমেই একটি মূল বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে যেন তারা নতুন খামারটি অবশ্যই অন্যান্য খাামার হতে দূরে স্থাপন করেন। খামারটি অন্য খামার হতে যত বেশী সম্ভব দূরে স্থাপন করা হবে ততই জীবাণু নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব হবে।
প্রতিটি খামারের বিভিন্ন ঘরের মধ্যে অধিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

ক) ফার্মের জন্য কি কি করণীয় ঃ
১) খামারে বাচ্চা আসার পূর্বেই কার্যকারী জীবণুনাশক দ্বারা বাচ্চার ঘর এবং ঘরে ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি (বাসন কোসন) জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
২) কোন বহিরাগত লোককে খামারের ঘরে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না এবং ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখতে হবে । ফার্মে যারা প্রবেশ করবে তাদেরকে অবশ্যই আলাদা জীবাণুমুক্ত কাপড় চোপড় জুতা সরবরাহ করতে হবে যাতে তারা এগুলি পরিধান করে খামারে প্রবেশ করতে পারেন। 
৩) প্রত্যেক খামারের প্রবেশ দ্বারের সম্মুখে এবং প্রত্যেক ঘরের দরজার সামনে একটি ট্রে অথবা বিশেষভাবে তৈরী জায়গায় জীবাণুনাশক রাখতে হবে যাতে ঘরে প্রবেশের পূর্বেই জীবাণূনাশকে পা ডুবিয়ে নেওয়া যায়। জীবাণূনাশকমুক্ত পানি ময়লা হওয়ার সাথে সাথেই পরিবর্তন করতে হবে।
৪) খাদ্য সামগ্রী বহনকারী ট্রাক কোন ক্রমেই খামারের ভিতর প্রবেশ করানো যাবে না। ট্রাক হতে খাদ্য সামগ্রী খামারের বাহিরে নামিয়ে তারপর ভিতরের গুদাম অথবা মুরগীর ঘরে নিতে হবে। যদি খাদ্য অথবা খাদ্যকণা মাটিতে পড়ে তবে সাথে সাথেই সরিয়ে ফেলতে হবে যাতে ইদুঁরের সমাগম না ঘটে।
৫) গবসময় টিকাদান এবং ঔষধ খাওয়ানোর কর্মসূচী বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী করতে হবে এবং তা পুরোপুরি পালন করতে হবে।
৬) গবসময় পরিস্কার ও টাটকা পানি বাচ্চাকে দিতে হবে এবং প্রতিদিনই পানির পাত্র পরিস্কার করে হাল্কাভাবে জীবাণূনাশক দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে।
৭) খামারের ভিতরে অথবা খামারের ঘরের ভিতরে অথবা আঙ্গিনায় উড়ন্ত পাখির চলাচল যতদূর সম্ভব বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে হবে।
৮) খামারের মৃত পাখি অবশ্যই বিশেষ জায়গায় পুড়িয়ে ফেলতে হবে। যদি একই জায়গায় অনেকগুলি ফার্ম থাকে তবে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় মৃত পাখি পুড়ানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে। মৃত পাখি খামার হতে সরানোর পর পুণরায় কাপড় পরিবর্তন ছাড়া খামারের ঘরে প্রবেশ করা যাবে না।
৯) বহিরাগত এবং অপ্রয়োজনীয় লোক খামারে প্রবেশ হতে বিরত রাখার জন্য চলাচল পথের বিভিন্ন জায়গায় সংকেতযুক্ত সাইনবোর্ড নজরে আসে এমন জায়গায় স্থাপন করতে হবে।
১০) ফার্মের কাছাকাছি কোন জায়গায় গরু ছাগল, মহিষ অথবা ভেড়ার ফার্ম স্থাপন করা যাবে না।
১১) খামারের ভিতরে অথবা খামারের কাছাকাছি দেশী মুরগী অথবা ঐ জাতীয় পাখি অথবা অন্য ধরনের পোষা পাখি পালন করা যাবে না।

খ)  খামারীদের জন্য কি কি পালনীয় ঃ
১) যদি সম্ভব হয় তবে অবশ্যই খামারে প্রবেশের পূর্বে কাপড় পরিবর্তন করে গোসল করার পর খামারে প্রবেশের জন্য আলাদাভাবে রক্ষিত কাপড় পরে প্রবেশ করতে হবে। যদি গোসল এবং কাপড় পরিবর্তনের কোন ব্যবস্থা না থাকে তাহলে নি¤œলিখিত সরঞ্জামাদি সবসময় খামারে রাখতে হবে।
পরিস্কার সাদা কাপড়ের কোট অথবা এপ্রোন 
লম্বা রাবারের বুট জুতা
ময়লা বা পরিত্যক্ত জিনিস রাখার জন্য প্লাষ্টিক অথবা পলিথিনের ব্যাগ
শক্ত ব্রাশ
জীবাণুনাষক সাবান 
জীবাণুনাশক
২) খামারের নিকট আসার পূর্বে গাড়ী, মটর সাইকেল খামার হতে একটু দূরে পার্ক করতে হবে।
৩) খামারে প্রবেশের পূর্বে পরিস্কার সাদা কোঁট, বুট জুতা, টুপি, পরিধানের পর হাত জীবাণুমুক্ত সাবান দিয়ে পরিস্কার করে নিতে হবে এবং যদি কোন যন্ত্রপাতি যেমন ছুরি, কাঁচি ওজন মেশিন ইত্যাদি নেওয়ার প্রয়োজন হয় তবে এগুলিকে জীবাণুনাশক দিয়ে পরিস্কার করতে হবে।
৪) খামার হতে বের হওয়ার আগে কোট, বুট জুতা এবং টুপি খুলে নিয়ে প্লাস্টিক অথবা পলিথিনের ব্যাগ ভরে রাখতে হবে যাতে এগুলি পরিস্কারের পর পুণরায় ব্যবহার করা যায়।
৫) গবসময় যে ঘরে কম বয়সের বাচ্চা থাকে সে ঘরে আগে প্রবেশ করতে হবে এবং যে ঘরে রোগাক্রান্ত বাচ্চা থাকে সেঘরে সর্বশেষে প্রবেশ করতে হবে।

গ)  লেয়ার ফার্মারদের জন্য করণীয় ঃ 
১) প্রথমে কমবয়সী পাখির ঝাঁক হতে এবং সর্বশেষে রোগাক্রান্ত পাখির ঝাঁক হতে ডিম সংগ্রহ করতে হবে। রোগাক্রান্ত পাখির ঝাঁক হতে ডিম সংগ্রহ করার জন্য যে সব ট্রে ব্যবহার করা হবে সেগুলো ভালভাবে পরিস্কার ও জীবাণুমুক্ত করে আলাদাভাবে রাখতে হবে।
২) যদি ডিম বহনকারী ট্রাকের ফার্মে প্রবেশের প্রয়োজন হয় তাহলে পূর্বে বর্ণিত পদ্ধতি যেমন কাপড় পরিবর্তন ইত্যাদি অনুসরন করতে হবে। কিন্তু ডিম বহনকারী ট্রাক যেগুলো দ্ধারা ফার্মের বাইরে ডিম সরবরাহ করা হয় সেগুলি ফার্মের ভিতরে প্রবেশ করানো যাবে না।
৩) ডিম বহনকারী ট্রাক অধিক বয়সের লেয়ার ফ্লক ফার্মের ডিম সর্বশেষে সংগ্রহ করবে।
৪) ডিম সংগ্রহ করার পূর্বে ডিমের ট্রেসহ অন্যান্য আনুষাঙ্গিক জিনিষপত্র ভাল জীবাণুনাশক দিয়ে পরিস্কার করতে হবে।
৫) ফার্ম হইতে বের হবার পূর্বে ফার্মে ব্যবহৃত কাপড় চোপড় প্লাষ্টিক অথবা পলিথিনে রাখতে হবে এবং যেখানে সেখানে ফেলে রাখা যাবে না। এগুলোকে ভালভাবে পরিস্কার করে পুণরায় ব্যবহারের জন্য রেখে দিতে হবে।
৬) কীটনাশক প্রয়োগ করে মশা, মাছি এবং অন্যান্য কীটপতঙ্গের বংশ বৃদ্ধি পাওয়ার প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রন রাখতে হবে।

ঘ) খাদ্য এবং বাচ্চা বহনকারীদের জন্য করনীয় ঃ
১) গাড়ী পার্ক করার পর ফার্মে প্রবেশের জন্য নির্ধারিত কাপড় পরতে হবে । গাড়ীর ভিতরে কাপড় পরা যাবে না।
২) কাজ শেষ করার পর ফার্মে প্রবেশের জন্য ব্যবহৃত কাপড়চোপড় প্লাষ্টিকের ব্যাগে রাখতে হবে। স্পর্শজনিত রোগ সংক্রমণ পরিহারের জন্য যেখানে সেখানে ফেলে রাখা যাবে না।
৩) গাড়ীতে যদি কোন একটি ফার্ম হতে আসা মাছি থাকে তবে তাৎক্ষণিকভাবে কীটনাশক প্রয়োগ করে এদেরকে মেরে ফেলতে হবে। যাতে অন্যকোন ফার্মে এরা বাহিত না হয়।
৪) খাদ্য অথবা বাচ্চা রোগাক্রান্ত খামারে সবশেষে নিয়ে যেতে হবে।
৫) কোন অবস্থাতেই খামারের ঘরের ভিতর প্রবেশ করা যাবে না।
ঙ) ভ্যাকসিনেটরদের জন্য করণীয় ঃ
১) খামারে প্রবেশের পূর্বে গোসল করতে হবে। যদি সম্ভব না হয় তবে কাপড়, জুতা পরিবর্তন করে এবং হাত জীবাণূনাশক সাবান দিয়ে পরিস্কার করার পর মুরগির ঘরে প্রবেশ করতে হবে।
২) এক ফার্ম হতে অন্য ফার্মে যাওয়ার আগে মোটর সাইকেল অথবা অন্য বাহন ভালভাবে জীবাণূমুক্ত করতে হবে।
৩) পাখির ঘরে প্রবেশের পূর্বে ঘরের সামনে রাখা জীবাণুনাশকযুক্ত পানিতে জুতা ডুবিয়ে নিতে হবে। 
৪) ঘরের ভিতরে কোন যন্ত্রপাতি সরবরাহ করার পূর্বে ভালভাবে জীবাণূমুক্ত করতে হবে।
৫) কাজ শেষ হওয়ার পর ফার্ম হতে বের হওয়ার পূর্বে ফার্মের কাপড় পরিবর্তন করে নিজের কাপড় পরে নিতে হবে।

চ) ফার্ম রোগাক্রান্ত হলে কি কি করণীয় ঃ
১) ফার্মের প্রধান গেটে বিশেষ সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি টাঙ্গিয়ে দিতে হবে।
২) ডিম, খাদ্য অথবা বাচ্চা বহনকারী যানবাহনের চালককে রোগ সম্পর্কে জানিয়ে দিতে হবে যাতে করে তারা ঐ রোগাক্রান্ত খামারে সবশেষে আসেন। 
৩) খামারীগণ রোগাক্রান্ত ঘরে সবশেষে প্রবেশ করবেন এবং অন্যকোন ঘরে গোসল ছাড়া অথবা কাপড় পরিবর্তন ছাড়া পরিদর্শন করবেন না।
৪) যদি কোন একটি জায়গায় অনেক ক্ষুদ্র খামার থাকে তাহলে সকলেই সকলের সাথে সহযোগিতা করবেন এবং চেষ্টা করবেন যাতে একই সময়ে সকলেই ফার্মে বাচ্চা উঠাতে পারেন এবং বিক্রয়ও করতে পারেন একই সময়ে। এই এক সাথে ঢোকা এক সাথে বাহির পদ্ধতিতে রোগের আক্রমণ কার্যকরীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।


Share on Facebook   Share on Twitter   Leave Your Comment  Share via Email  Google Plus 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


61, Joarsahara (1st floor), Dhaka-1000
Copyright © 2017 monthly Poultry Khamar Bichitra. All Right Reserved.