সোমবার || ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯ || ৬:১৫:১৩ অপরাহ্ন

Disease

প্রাথমিক অবস্থায় মুরগির বাচ্চার মৃত্যুর কারণ ও প্রতিকার

প্রকাশ: শুক্রবার || ফেব্রুয়ারী ১ ২০১৯ || ১২:৫১:৩৬ PM

Share on Facebook   Share on Twitter   Leave Your Comment  Share via Email  Google Plus 

মোঃ মজিবর রহমান বি.এস.এস পর্যন্ত লেখাপড়া জানা একজন বেকার যুবক। একটা কোম্পানীতে চাকুরি করতেন কিন্তু ওখানে কম বেতনে তার সুবিধা হচ্ছিল না। তাই তিনি চাকুরি ছেড়ে কিছু পুঁজি সংগ্রহ করে ১৫০০-২০০০ ব্রয়লার মুরগি পালন করা যায় এমন একটা খামার গড়ে তোলেন এবং মুরগি পালন শুরু করেন। প্রথম ব্যাচে ১০০০ টি ১ দিন বয়সের ব্রয়লার বাচ্চা ক্রয় করেন এবং বিভিন্ন কারণে তার মোট ২০টি বাচ্চা মারা যায়। রেডি ব্রয়লারের বাজার মূল্য কম থাকায় তার ৩০ হাজার টাকা নিট লাভ হয়। পরের ব্যাচে মাত্র ১০টি বাচ্চা মারা যায়। এবং বিক্রি শেষে ভালোই লাভ হয়। এভাবে পর পর তিন ব্যাচ মুরগি সফলতার সাথে পালন করে তিনি তার খামার আরো বড় করার কথা ভাবতে থাকেন। এই ধারাবাহিকতায় তিনি পরের ব্যাচে ৭০০ বাচ্চা উঠান। সবকিছু ঠিক মতোই চলছিল, কিন্তু ১০ দিন বয়সে কয়েকটা বাচ্চা অস্বাভাবিক মনে হয়। পরের দিন থেকে বাচ্চা মরা শুরু করে এবং মোট ১৭০ টি বাচ্চা মারা যায়। এই ব্যাচে রেডি মুরগি সর্বোচ্চ দামে বিক্রি করেও তার মাত্র ৫ হাজার টাকা লাভ হয়।
মুরগি পালন বা খামার লাভজনক হওয়ার জন্য অনেকগুলো ফ্যাক্টর জড়িত। উপরের ভূমিকা পর্যালোচনা করে এটা অবশ্যম্ভাবী হিসেবে প্রতীয়মান হয় যে, মুরগির মৃত্যুহার খামার লাভজনক হওয়ার একটা বড় অন্তরায়। যে কোন বয়সে মুরগির মৃত্যু ঘটতে পারে, তবে জীবনের প্রারম্ভিক অবস্থায় মুরগির বাচ্চার মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি থাকে। এই বিষয়টি একজন খামারির জানা থাকলে সহজেই প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে খামার লাভজনক করা সম্ভব। প্রাথমিক অবস্থায় বা জীবনের প্রথম পর্যায়ে মুরগির বাচ্চার মৃত্যুর জন্য অনেক কারণ জড়িত। এসব কারণের মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলো হলো-
ব্যবস্থাপনাজনিত ক্রটি;
পুষ্টিজনিত;
রোগবালাই;
কৌলিতাত্ত্বিক।
ব্যবস্থাপনাজনিত ক্রটি ঃ
মুরগির খামার পরিচালনা বা মুরগি পালনের ক্ষেত্রে খামার ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা, টিকা প্রদান, ঠোট কাটা এবং আনুষঙ্গিক অপরিহার্য সকল বিষয়াদি যথাযথ কার্যকর হওয়ার ক্ষেত্রে উত্তম খামার ব্যবস্থাপনা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। মুরগির বিভিন্ন বয়সে ব্যবস্থাপনার ধরন ভিন্ন হতে পারে মুরগির বাচ্চা পালনের ক্ষেত্রে খামার ব্যবস্থাপনার কিছু অগ্রাধিকারমূলক আলোচনায় সংক্ষেপে আলোকপাত করা হলো।
ব্রুডিং এবং ব্রুডিং তাপমাত্রা ঃ
মুরগি যে পদ্ধতিতেই পালন করা হোক না কেন ব্রুডিং পিরিয়ড খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্রুডার হাউজে ২-৩ ইঞ্চি পুরো শুকনা কাঠের গুঁড়া বা তুষ বিছিয়ে বিছানা বা লিটার প্রদান করতে হবে। লিটার মুরগির পায়খানার ভেজা ভাব বা ময়েশ্চার শোষণ করে ফেল রোগজীবাণু জন্মাতে পারে না। মুরগির শেডে বাচ্চা প্রবেশের পূর্বে এমনকি লিটার সামগ্রি বিছানোর পূর্বে ব্রুডার চালু করে ঘরের তাপমাত্রার প্রয়োজনীয় মাত্রা নিশ্চিত করতে হবে। লিটার সামগ্রি বিছানোর পর তাপের ব্যবস্থা করা হলে লিটারের নিচে ঢেকে পড়া ফ্লোরের তাপমাত্রা কম থাকবে এবং এর ফলে ব্রুডার চালুর পর ফ্লোরের ময়েশ্চার কারণে তাপ শোষণ করে ঘরের তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়। যে কারণে বাচ্চার সমস্যা হতে পারে। ব্রুডার হাউজের উচ্চ ও নি¤œ তাপমাত্রা এই দুই ধরনের অবস্থা তৈরি হতে পারে যা মুরগির বাচ্চার বেঁচে থাকা এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদন সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে যদি ব্রুডার হাউজে তাপমাত্রা খুব বেশি হয় তাহলে মুরগির বাচ্চা পানি শুণ্যতায় ভুগবে। আমরা জানি মুরগির শরীরের ৭০ ভাগ হলো পানি। যদি উচ্চ তাপমাত্রা অবিরতভাবে চলতে থাকে বা স্থায়ী হয় তাহলে মুরগির দেহ থেকে পানি শোষিত হয়, যখন এই হ্রাস ১০ ভাগে পৌছায় তখন মুরগির বাচ্চা পানি শূণ্যতায় মারা যেতে পারে। এছাড়া ব্রুডিং এর তাপমাত্রা বেশি হলে পায়খানা শুকিয়ে পায়ুপথের চারদিকে জমা হয়ে পায়ুপথ বন্ধ হয়ে যায় এবং এই অবস্থা তৈরি হলে মুরগির বাচ্চা মারা যায়। এই অবস্থাকে পাস্টিং বলা হয়। আবার যদি ব্রুডার হাউজে তাপমাত্রা হয় তাহলে মুরগির বাচ্চার শরীরের তাপমাত্রা কমে যায় এই অবস্থাকে ব্রুডিং বা ব্রুডার নিউমোনিয়া বলে এবং এ রকম অবস্থা তৈরি হলে ফুসফুস নীল হয়ে মুরগির বাচ্চা মারা যেতে পারে। এছাড়া ব্রুডার হাউজের তাপমাত্রা কম হলে দৈহিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে বা শরীর গরম রাখতে মুরগির বাচ্চা একত্রে জড়ো হয় যাকে পাইলিং আপ বলা হয়। পাইলিং আপ হলে মুরগির বাচ্চা শ্বাসরোধ হয় মারা যায়।
প্রতিরোধ ঃ
ব্রুডিং পিরিয়ডে পানিশূণ্যতা, পাস্টিং, পাইলিং আপ প্রতিরোধ তথা বাচ্চার মৃত্যু প্রতিরোধ করতে হলে ব্রুডার হাউজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে মুরগির স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধের জন্য একটা “কমফোর্ট” জোন তৈরি করতে হবে এবং এই জোনের মধ্যে বাচ্চার অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। শুধুমাত্র তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণই যথাযথ ব্রুডিং নয়, ভালো ব্যবস্থাপনা অনুশীলন করাও উত্তম ব্রুডিং এর বিবেচ্য বিষয়।

বিষক্রিয়া ঃ
জীবনের প্রথম দিনগুলোতে মুরগির বাচ্চা খুবই দুর্বল থাকে। তাই কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতার প্রতি সহনশীলতা কম হয়। সরবরাহকৃত খাদ্যে যদি ব্যাকটেরিয়া, ফাংগাস ইত্যাদির উপস্থিতি থাকে তাহলে খাদ্যে বিষক্রিয়াজনিত কারণে মুরগির বাচ্চা মারা যেতে পারে। খাদ্য বা পানিতে যতি অতিরিক্ত লবণ থাকে তাহলেও মৃত্যুর কারণে হতে পারে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ মুরগির শেডই কম্বাইন্ড শেড। এখানে একই শেডে মুরগির বাচ্চা ব্রুডিং করা হয় এবং শেষদিন পর্যন্ত মুরগি পালন করা হয়। তাই ব্রুডিং এর সময় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্দা ব্যবহার করা হয় এবং তাপমাত্রা কমে যেতে পারে এই বিবেচনায় ঘর দীর্ঘ সময় পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখলে শেডে অ্যামোনিয়াসহ বিষাক্ত গ্যাস উৎপন্ন হয়। যদি বিষাক্ত গ্যাসের পরিমাণ ১০০ পিপিএম উপরে হয় তাহলে মিউকাস মেমব্রেন এবং চোখে জ্বালা তৈরি করে এর ফলে মুরগির বাচ্চার খাদ্য গ্রহণ, দৈহিক বৃদ্ধির হার কমে যায় এবং ট্রাকিয়ার সিলিয়া ক্ষতিগ্রস্ত ও রক্তক্ষরণ হতে পারে যা মুরগির বাচ্চার মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

আঘাতজনিত মৃত্যু ঃ
ছোট অবস্থায় মুরগির বাচ্চা খুব দুর্বল থাকে এজন্য সব সময় পরিবেশের প্রতিক্রিয়ায় স্বতঃস্ফূর্ত ক্রিয়াশীল থাকে না তাই বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম যেমন-টিকা প্রদান, ঠোঁটকাটা ইত্যাদির সময় যদি মুরগির বাচ্চা অসতর্কতার সাথে হ্যান্ডলিং করা হয় তাহলে মুরগির বাচ্চার মৃত্যুর কারণে হতে পারে।
অভূক্ত থাকা ঃ
কোনো প্রাণি অনেক সময় ধরে অভূক্ত থাকলে বা না খাইয়ে রাখলে ঐ প্রাণির শরীরে সঞ্চিত চর্বি গ্রহণ করে শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম স্বাভাবিক রেখে বেঁচে থাকে। কিন্তু মুরগির বাচ্চার ছোট অবস্থায় শরীরে চর্বি সঞ্চিত থাকে না তাই কোনো কারণে বেশি সময় ধরে অভূক্ত থাকলে মারা যেতে পারে। ফ্লোরে মুরগির জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকা দরকার। অল্প জায়গায় অধিক মুরগি রাখলে লিটার নষ্ট হয়ে যায় এর ফলে বিভিন্ন জীবাণুর বংশ বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। খাদ্য ও পানি পাত্রের পরিমাণ কম হলে অনেক মুরগির বাচ্চা একসাথে খেতে পারে না। এর ফলে অভূক্ত থাকার কারণে মুরগির বাচ্চার মৃত্যু ঘটে থাকে।

ঘরের আর্দ্রতা ঃ
ব্রুডিং পিরিয়ডে মুরগির ঘরে ৫০-৭০ ভাগ আর্দ্রতা থাকা দরকার। ব্রুডার হাইজের আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৭০ ভাগের বেশি হলে তা বিভিন্ন অনুজীবের বংশ বিস্তারের জন্য অনুকুল। ব্রুডিং পিরিয়ডে উচ্চ আপেক্ষিক আর্দ্রতা মুরগির বাচ্চার দৈহিক বৃদ্ধি কমে যায়, যা পুরো জীবনচক্রে আর পূরণ হয় না। আর্দ্রতা বেশি হওয়ার অর্থ অ্যামোনিয়া গ্যাস উৎপন্ন হওয়া। আর অতিরিক্ত অ্যামোনিয়া গ্যাস মুরগির বাচ্চার মৃত্যুর কারণ হতে পারে। মুরগির ঘরের ভেন্টিলেশন বা বায়ু চলাচল ব্যবস্থা উন্নত করে অতিরিক্ত আর্দ্রতা তথা অ্যামোনিয়া উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
পানি ঃ
পানি জীবনের জন্য এক অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান এবং তরল পদার্থ। জীবন রক্ষা ছাড়াও মুরগির  স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও উৎপাদন সক্ষমতার জন্য পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পুষ্টি উপাদান ও খাদ্য নির্যাস রক্তে পৌঁছানোর জন্য পরিবহন যোগাযোগ মাধ্যম হিসাবে কাজ করে। পরিবেশের উচ্চ তাপমাত্রার সময় দেহ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। ব্রয়লার মুরগির দৈহিক ওজন বৃদ্ধির জন্য পানির ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সোডিয়াম, ক্লোরিন, ফসফরাস প্রভৃতি খনিজ উপাদানের উৎস হিসেবে কাজ করে। সকল জীবের অধিকাংশ রোগই পানিবাহিত তাই মুরগির বাচ্চাকে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ ও সতেজ পানি সরবরাহ করতে হবে। পানির অভাব বা দূষিত পানি সরবরাহের কারণে মুরগির বাচ্চার মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
পুষ্টিজনিত কারণ  ঃ
জীবন ধারণ বা বেঁচে থাকা, রোগ প্রতিরোধ এবং উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিবিধান অত্যাবশ্যক। মুরগির বাচ্চার জীবনের প্রথম অবস্থায় এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহ বিবেচ্য। হ্যাচিংয়ের পর ৪৮-৭২ ঘন্টা সময় পর্যন্ত কুসুমথলি মুরগির বাচ্চার পুষ্টির উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। যদিও এটি মুরগির বাচ্চা সবচেয়ে সমৃদ্ধ মাতৃ  এন্টিবডি ও ভিটামিনের উৎস তবুও তা সম্পূর্ণ পুষ্টি সরবরাহ করতে পারে না। তাই সাধারণ স্বাস্থ্যগত অবস্থা, ইমিউনিটি এবং ক্ষুদ্রান্ত্রের বৃদ্ধির জন্য যত দ্রুত সম্ভব সম্পূরক পুষ্টি সরবরাহ করতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে মুরগির বাচ্চার বৃদ্ধি কেমন হবে তা নির্ধারণে ক্ষুদ্রান্ত্রের ভূমিকার কথা জানা থাকা দরকার। ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রারম্ভিক বৃদ্ধি মুরগির ভবিষ্যৎ কার্যকর বৃদ্ধির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মুরগির জীবনের প্রথম কয়েকদিনে ক্ষুদ্রান্ত্রের ডেভলপমেন্ট ঘটে তাই এই সময়ে যে কোনো ধরনের বিচ্যুতি ভবিষ্যৎ সক্ষমতার জন্য বিপর্যস্ত হতে পারে।
খাদ্য ঃ
খাদ্য পাত্র তাপের উৎসের কাছাকাছি স্থাপন করা উচিত, তবে একেবারে বালবের নিচে নয়। মুরগির বাচ্চাকে বেশি ম্যাশ ফিড খাওয়ানো হলে খাদ্যথলি বন্ধ হয়ে যায় এবং দম বন্ধ হয়ে মুরগির বাচ্চা মৃত্যুহার বেড়ে যায়। আবার ভুট্টার ভাংগা যদি বড় আকারের হয় তাহলে ‘পৎড়ঢ় নড়ঁহফ’ হতে পারে।
ভিটামিন ঃ
ভিটামিন এ, ডি, ই ও কে এর তীব্র অভাব হলে মুরগির বাচ্চার মৃত্যু ঘটে এবং সাধারণ অভাবজনিত কারণে দৈহিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়, পালক উসকোখুসকো দেখায়, অন্ধত্ব, রিকেট, এনসেফালোমেলাশিয়া, এক্সুডেটিভডায়াথেসিস, রুক্তশূন্যতা প্রভৃতি রোগ হয়। একইভাবে ভিটামিন বি-কমপ্লেক্সে এবং ভিটামিন সি এর তীব্র অভাবজনিত কারণে মৃত্যু হয় এবং সাধারণ অভাবজনিত কারণে মুরগির বাচ্চা ওজন হারায়, ভালোভাবে পালক উঠেনা, চর্মরোগ, পেরোসিস, ¯œায়ুবিক রোগ ও রক্তশূন্যতা তৈরি হয়। ভিটামিন ডি এর অভাবে মুরগির বাচ্চার ঠোঁট ও নখ নরম হয় এবং পা খুব দুর্বল হয়। ভিটামিন এ এর অভাবে বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, দুর্বল, তন্দ্রাচ্ছন্ন, ভারসাম্যহীন এবং শুকিয়ে যায়। ফলিক এসিডের অভাবে ভালোভাবে পালক গজায় না, বৃদ্ধি ব্যাহত ও রক্তশূন্যতা হয়। ভিটামিন ই এর অভাবে ¯œায়ুবিক দুর্বলতা দেখা দেয়, চামড়ার নিচে ইডিমা দেখা দেয়। এসব ভিটামিন সমূহ কেবল মুরগির বাচ্চার দৈহিক বৃদ্ধিকেই ত্বরান্বিত করে না রোগ প্রতিরোধের জন্যও দরকার। অ্যামাইনো এমিড বিশেষ করে আর্জিনিন, থিওনিন এবং মিথিওনিন মুরগির রোগ প্রতিরোধ সিস্টেম ডেভলপমেন্ট এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রোগজনিত কারণ ঃ
সারা দুনিয়ায় মুরগির খামার পরিচালনায় বিশেষ করে মুরগির বাচ্চা পালনের ক্ষেত্রে সংক্রামক রোগ একটা প্রধান অন্তরায় এবং অন্যতম আর্থিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঊষ্ণমন্ডলীর দেশে এর প্রভাব মুরগি পালনের ক্ষেত্রে আরো সংকটময় অবস্থা তৈরি করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মুরগির খামার ব্যবস্থাপনায় রোগ, রোগ সংক্রমণ, প্রতিরোধ ও প্রতিকারের বিষয়টি ভিন্নমাত্রায় দৃশ্যমান। অধিকাংশ খামার ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত নি¤œমানের হওয়ায় খামারীগণ রোগ সংক্রমণের বিষয়টি স্বাভাবিক নয় দ্বিগুণ, তিনগুণ মাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করে সতর্কতা অবলম্বন করেও সংক্রমণ খুব একটা কমাতে পারে না। রোগ সংক্রমণের কারণে অত্যাধিক মৃত্যুহার এবং মাংস ও ডিম উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ার কারণে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের কারণে কুসুমথলির ক্ষত ও ইনফেকশনে বাচ্চা মুরগির মৃত্যুহার বেশি হয়। বাচ্চা অবস্থায় ৩০-৩৫% মুরগির মৃত্যুর জন্য এন্টারোব্যাকটেরিয়াল অর্গানিজম দায়ী। শুধু সালমোনেলা সংক্রমনই বারবার ঘটে এর পরে কলিবেসিলেসিস এবং ৩-৪ দিন বয়সে প্রাদুর্ভাব ঘটে থাকে। ই. কোলাই অন্যান্য জীবাণুর সাথে কুসুমথলির সংক্রমণ ঘটায় এবং এ কারণে ৫-৬ ভাগ বাচ্চার মৃত্যু ঘটে। এছাড়া মাইকোপ্লাজমা এবং সিআরডি সংক্রমণের কারণে শ্বাসকষ্টে ভুগে ৩-৪ দিন বয়সে অনেক বাচ্চার মৃত্যু ঘটে। যে খামারের বিভিন্ন বয়সের মুরগি থাকে এবং গামবোরো টিকা প্রদান করা হয় সেখানে মুরগির বাচ্চার শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা তৈরি হয়। ৩-৪ সপ্তাহ বয়সে গামবোরো রোগে ব্যাপক মুরগি মারা যায়। ওমফোলাইটিস একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত একটি রোগ যা মুরগির বাচ্চা ফুটার পরে হয়, নাভী ইনফেকশন, নাভীর চারপাশের চামড়া প্রদাহ, তলপেট নরম, থলথলে, ফাঁপা হয়। পায়ুপথ বন্ধ থাকে এবং মৃত বাচ্চা কাটলে অব্যবহৃত কুসুমের দুর্গন্ধ বের হয়। সালমোনেলা, ই. কোলাই, কলিবেসিলোসিস, প্লুরাম, মাইক্রাপ্লাজমা প্রভৃতি রোগে বাচ্চ অবস্থায় মুরগির বেশি মৃত্যু ঘটে।
কৌলিতাত্ত্বিক কারণ ঃ
মুরগিতে প্রায় ২১টি লিথাল মিউটেশন বা প্রাণঘাতী পরিবর্তন ঘটে এবং ইনকুবেশনের ৩য় সপ্তাহে হোমোজাইগোটে সুস্পষ্ট হয়। লিথাল জিনের কারণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন সাধিত হয় এবং বাচ্চার মৃত্যু ঘটে। এক্ষেত্রে সাধারণত ইনকুবেশন পিরিয়ডে মুরগির বাচ্চার মৃত্যু ঘটে থাকে। একে এমব্রায়োনিক ডেথ বলা যেতে পারে। একজন সাধারণ খামারির ক্ষেত্রে এটা প্রতিরোধের তেমন কার্যকর উপায় থাকে না।
“ভালো শুরু কাজের অর্ধেক” প্রচলিত এই বাক্যটি মুরগি খামার পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বাধিক কার্যকর। কারণ ভালো শুরু মানেই সুস্থ, সবল এবং অধিক উৎপাদনশীল মুরগি। ব্রয়লার, লেয়ার সব মুরগির ক্ষেত্রেই জীবনের প্রথম সপ্তাহ খুবই সমস্যা সংকুল। বর্তমান সময়ে মুরগির কৌলিতাত্ত্বিক সম্ভাবনা বা জেনেটিক পটেনশিয়ালিটি বিবেচনায় ভালো উৎপাদন পেতে ভালো শুরু এবং সর্বোচ্চ পরিচর্যা প্রয়োজন। মুরগি খামার থেকে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের পথে প্রথম পদক্ষেপ হলো ভালো মানের বাচ্চা নিয়ে শুরু করা। ভালো মানের বাচ্চা বলতে যে বাচ্চার সমরূপতা, উজ্জ্বল প্রাণবন্ত চাহনি, সুন্দর পালক, হৃষ্টপুষ্ট অনুভূত দেহ এবং বেশি দৈহিক ওজন। ভালো গুণাবলীসম্পন্ন বাচ্চার পরিবেশের প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে বেঁচে থাকার সক্ষমতা দুর্বল বা কম গুণাবলি সম্পন্ন বাচ্চার চেয়ে বেশি থাকে।

লেখক পরিচিতি
এস এম জাকির হোসেন
কৃষি, মৎস্য, পোল্ট্রী ও  প্রাণী সম্পদ বিষয়ক
গবেষক, বিশ্লেষক, উদ্যোক্তা,
কলাম লেখক, কৃষি সাংবাদিক।
দিনাজপুর।
মোবাইল-০১৭৭২-৯৩৩৬০৬
তারিখঃ ১৪-০১-২০১৯ইং।

Share on Facebook   Share on Twitter   Leave Your Comment  Share via Email  Google Plus 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


61, Joarsahara (1st floor), Dhaka-1000
Copyright © 2017 monthly Poultry Khamar Bichitra. All Right Reserved.